কাউন্টি ক্রিকেটের আদলে এনসিএলে চালু হচ্ছে সেকেন্ড ইলেভেন টুর্নামেন্ট

এনসিএল
বিসিবি
বিসিবি
ক্রিকফ্রেঞ্জি ডেস্ক
ক্রিকফ্রেঞ্জি ডেস্ক
মিরপুর শের-ই বাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামের কনফারেন্স রুমে বসে দর্শকদের স্বস্তির জন্য স্টেডিয়ামের ইস্ট জোনে ছাউনী বসানোর কথা জানালেন তামিম ইকবাল। পরবর্তীতে পরিবেশ রক্ষা ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে পুরো স্টেডিয়ামের ছাউনীতে সৌরবিদ্যুৎ বসানোর প্রাথমিক আলোচনাও সামনে আনলেন বিসিবির এডহক কমিটির চেয়ারম্যান। তবে তামিম জানালেন, তৃতীয় সিদ্ধান্তটা বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কাউন্টি ক্রিকেটের আদলে জাতীয় ক্রিকেট লিগ (এনসিএল) মূল দলের পাশাপাশি একটি সেকেন্ড ইলেভেন টুর্নামেন্ট আয়োজনের কথা জানালেন তামিম। সেই টুর্নামেন্ট নিয়ে বিস্তারিত ধারণাও দিলেন বাংলাদেশের সাবেক অধিনায়ক।

দেশের সবকটি বিভাগকে নিয়ে প্রতি বছরই সাদা পোশাকের এনসিএল আয়োজিত হয়ে থাকে। টুর্নামেন্টের প্রতি মৌসুমে ৮টি বিভাগ অংশ নেয়। প্রাথমিকভাবে বিভাগের দলগুলো ৩০ জন ক্রিকেটারকে বাছাই করে। তবে সেখান থেকে সিলেট, রাজশাহী কিংবা চট্টগ্রামের বিভাগের হয়ে ১৫ জন করে ক্রিকেটার মূল দলে সুযোগ পান। বাকিদের কারও ম্যাচ খেলার সুযোগ থাকে না। অর্থাৎ পুরো টুর্নামেন্ট চলাকালীন তাদেরকে বসে থাকতে হয়।

সেই ধারায় পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিসিবি। কাউন্টি ক্রিকেটের আদলে এনসিএলকে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা করছে তারা। ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ডের (ইসিবি) অধীনে ইংলিশ কাউন্টিতে ১৮টি দল অংশ নিয়ে থাকে। প্রতিটি দলেরই আবার একটি সেকেন্ড ইলেভেন দল রয়েছে। মূল দলে জায়গা না পাওয়া ক্রিকেটার, পুনর্বাসনে থাকা ক্রিকেটার ও একাডেমির তরুণ ক্রিকেটাররা সেকেন্ড একাদশে সুযোগ পেয়ে থাকে।

এনসিএলেও প্রতিটি বিভাগকে দুইটি করে দল গঠনের দায়িত্ব দেবে বিসিবি। উদাহরণ হিসেবে চট্টগ্রামের প্রথম একাদশটা এনসিএলের মূল টুর্নামেন্টে খেলবে। বাকি যারা থাকবে তারা সেকেন্ড ইলেভেনের হয়ে খেলবেন। যার ফলে কাউকেই তখন খেলার বাইরে থাকতে হবে না। চলতি মৌসুম থেকেই এনএসিএলে এমন কিছু চালু করতে যাচ্ছে দেশের ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা। সেকেন্ড ইলেভেন টুর্নামেন্টের ফলে আরও দেড়শ কিংবা দুইশ জন ক্রিকেটার সম্পৃক্ত হতে পারবে বলে মনে করেন তামিম।

বিসিবির এডহক কমিটির প্রধান বলেন, ‘আমরা সবাই মিলে একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবং সব ঠিক থাকলে এই মৌসুম থেকেই শুরু করব। আপনারা সবাই কাউন্টি ক্রিকেটের ব্যাপারে জানেন। কাউন্টি ক্রিকেট প্রথম একাদশ এবং দ্বিতীয় একাদশ থাকে। উদাহরণ হিসেবে মিডলসেক্স প্রথম একাদশ, মিডলসেক্স দ্বিতীয় বিভাগ। এখন থেকে এনসিএল যখন শুরু হবে চট্টগ্রামের দুইটা দল থাকবে— প্রথম একাদশ এবং দ্বিতীয় একাদশ। ঢাকাসহ বাকিদের ক্ষেত্রেও প্রথম একাদশ এবং দ্বিতীয় একাদশ থাকবে।’

তামিম আরও যোগ করেন, ‘এটার লাভ কী, লাভটা জানা জরুরি। আপনাদের সাংবাদিকদের মধ্যেও অনেকে ক্রিকেট খেলেছেন আমি জানি। প্রথম একাদশের কিছু খেলোয়াড় থাকে যারা তাদের জীবনের বেশিরভাগ সময় ১২তম, ১৩তম এবং ১৪তম খেলোয়াড় হয়ে থাকে, তারা কোন সময় খেলার সুযোগ পায় না। প্রথম, দ্বিতীয় বিভাগের জন্য আরেকটা টুর্নামেন্ট যে করব এটাও কোন কিছু আমাদের সিস্টেমে ছিল না। দ্বিতীয় একাদশ যখন আমরা করা শুরু করব তখন আমরা আরও ১০০/১৫০ কিংবা ২০০ জন ক্রিকেটারকে সম্পৃক্ত করতে পারব।’

এনসিএল ক্রিকেট কিংবা ঢাকা প্রিমিয়ার লিগকে একটা সময় পিকনিক ক্রিকেট টুর্নামেন্ট বলা হতো। অনেক সময়ই রাডারের বাইরে থেকে খেলোয়াড় এনে যাকে তাকে খেলানোর অনেক অভিযোগই এসেছে পূর্বে। সেটার জন্য ক্রিকেটারদের পাশাপাশি বোর্ডকেও দায় দিচ্ছেন তামিম। নতুন টুর্নামেন্টের ফলে কী ধরেন সুবিধা হবে সেটাও উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়েছেন এডহক কমিটির প্রধান। তার বিশ্বাস, এখন আর কাউকে বাসা থেকে তুলে এনে ম্যাচ খেলাতে হবে না।

তামিম বলেন, ‘দ্বিতীয় একাদশের ম্যাচগুলো হবে ৩দিনের ম্যাচ, এটার চার দিনের হবে না। এখানে সুবিধা যেটা হবে ধরুণ, ঢাকা এনসিএলের ম্যাচ খেলছে, দুদিন পর তাদের খেলা রাজশাহীর সাথে। উদাহরণ হিসেবে রাজশাহীতে ৪ জন বাঁহাতি ব্যাটার আছে এবং ঢাকার দলে কোন অফ স্পিনার নেই। আমরা তখন কী করি? আমরা অমুককে ফোন করি, ওই কই আছে, ধরে নিয়ে এসে তাকে পরবর্তী ম্যাচ খেলিয়ে দিই। এই যে পিকনিক ক্রিকেটের যে কথাটা জাতীয় লিগের ক্ষেত্রে উঠে আসে পিকনিক ক্রিকেটের জন্য দায়ী কিন্তু শুধু ক্রিকেটাররা না, আমরা ক্রিকেট বোর্ডও। কারণ আমরাই ওই সংস্কৃতিটা তৈরি করে দিয়েছি দেখে আজকে এই কথাগুলো বলতে হয়।’

‘এখন আর কাউকে বাসা থেকে তুলে আনতে হবে না, দ্বিতীয় একাদশে ওই অফ স্পিনার খেলতে থাকবে এবং প্রথম একাদশ দেখতে পারবে দ্বিতীয় একাদশের ওই ছেলেটা কেমন পারফরম্যান্স করছে। পরবর্তী ম্যাচের আগে তাকে নিয়ে আসতে পারবে এখানে। একইভাবে কেউ যদি প্রথম একাদশে ধুঁকছে, দুইটা-তিনটা ম্যাচ সে খারাপ খেলছে। আমরা কী করি তাকে পুরোপুরি দল থেকে সরিয়ে দিই। তখন তার কাছেও একটা সুযোগ থাকবে দ্বিতীয় একাদশে এসে ম্যাচগুলো খেলে, সম্ভবত দুইটা-একটা ম্যাচে ভালো খেলে তার সুযোগ থাকবে সামনে এসে যাওয়ার।’

সেকেন্ড ইলেভেনের টুর্নামেন্টকে অনেক সময় চোটে পড়া ক্রিকেটারদের ফেরার পাথওয়ে হিসেবে ধরা হয়। গত বছর চোট থেকে ফেরা জফরা আর্চারের উদাহরণ টেনেছেন তামিম। লম্বা সময়ের চোটের সঙ্গে লড়াই করা আর্চার কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশিপে ফেরার আগে সাসেক্সের সেকেন্ড ইলেভেনের হয়ে ম্যাচ খেলেছেন। পরবর্তীতে কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশিপ হয়ে জাতীয় দলে ফেরেন ইংল্যান্ডের তারকা পেসার। অথচ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে হয় উল্টো। সেটাও মনে করিয়ে দিয়েছেন তামিম নিজেই।

তাসকিন আহমেদের উদাহরণ টেনে তামিম বলেন, ‘আমার মনে হয় বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ এই টুর্নামেন্টটা। প্রত্যেকটা দলের একটা দ্বিতীয় দল থাকবে। ধরুন, তাসকিন আহমেদ যখন ইনজুরিতে পড়ে, ইনজুরিতে পড়ার পর যখন ম্যাচ খেলতে হয় তখন আমরা কী করি? তখন আমরা তাকে পাঠিয়ে দিই প্রথম শ্রেণির একটা ম্যাচ খেলতে। আমরাই বলে দিই ও যেন ৬ ওভারের বেশি বল না করে।’

‘এই জিনিসটাকে পিকনিক ক্রিকেট আমরাই বানিয়ে রেখেছিলাম। প্রথম শ্রেণির ম্যাচে এই নিয়ম আমরা কেন করব? তাসকিন যাবে দ্বিতীয় একাদশে, ওইখানে নিয়ম-কানুন সহনশীল থাকতে পারে। উদাহরণ হিসেবে যদি দেখতে চান জফরা আর্চার যখন ইনজুরি থেকে উঠে এসেছে সে কিন্তু সরাসরি কাউন্টি ম্যাচ খেলে নাই। সে প্রথম ম্যাচ খেলেছে দ্বিতীয় একাদশের হয়ে, সেখানে নিয়ম কিছুটা সহনশীল থাকে।’

একটা সময় এনসিএল ক্রিকেটে হোম অ্যান্ড অ্যাওয়ে পদ্ধতি ছিল। তামিম নিজেও সেটার উদাহরণ টেনেছেন। বিসিবির এডহক কমিটির প্রধান জানিয়েছেন, তার ক্রিকেট ক্যারিয়ারের সময় লঞ্চে করে বরিশালে খেলতে গিয়েছেন। এ ছাড়া রাজশাহী ও খুলনাতে খেলার স্মৃতিও সামনে এনেছেন। তামিমের চাওয়া, এই মৌসুম থেকেই হোম অ্যান্ড অ্যাওয়েতে এনসিএল ফিরিয়ে আনবে বিসিবি। কয়েকটি স্টেডিয়ামে জটিলতা থাকলেও সেটা কাটিয়ে উঠতে চায় তারা।

তামিম বলেন, ‘আমি যখন প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলতাম আমি কিন্তু লঞ্চে করে বরিশাল গিয়েছি, রাজশাহীও গিয়েছি, খুলনাতেও গিয়েছি। কোন এক কারণে আমাদের হোম অ্যান্ড অ্যাওয়ে সিস্টেমটা বন্ধ হয়ে গেছে। আমরা এই মৌসুম থেকে চেষ্টা করব যে জায়গাগুলোতে খেলার উপযোগী মাঠ আছে, যেগুলো একটা প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট ম্যাচ চালানোর মতো অবস্থা আছে ওই জায়গাগুলোতে আমরা হোম অ্যান্ড অ্যাওয়ে শুরু করে দিব।’

‘কিছু কিছু জায়গায় আমাদের কিছু জটিলতা আছে, এই মৌসুমে পুরোপুরি হোম অ্যান্ড অ্যাওয়ে হবে না। উদাহরণ হিসেবে খুলনার যদি খেলার মাঠ থাকে তাহলে কেন খুলনা খেলবে না। বরিশালের মাঠ তৈরি হচ্ছে আমি শুনেছি। বরিশালের মাঠ তৈরি হলে বরিশাল কেন তাদের মাঠে খেলবে না। বরিশাল, খুলনার মানুষ ডিজার্ভ করে তারা তাদের সুপারস্টারদের খেলতে দেখবে। এভাবেই আপনি ক্রিকেট প্রমোট করতে পারেন।’

এনসিএলে খেলা ক্রিকেটাররা এখন থেকে ১ লাখ টাকা ম্যাচ ফি পাবেন। এ ছাড়া ঘরোয়া ক্রিকেটে চুক্তিতে থাকা ক্রিকেটারদের মধ্যে যারা সর্বোচ্চ ক্যাটাগরিতে আছেন তারা বেতন পাবেন ৬৫ হাজার টাকা। তামিম নিশ্চিত করেছেন, একই রকম সুযোগ-সুবিধা থাকবে না। তবে মিনিমাম সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। টুর্নামেন্টের ম্যাচগুলো হবে তিন দিনের।

তামিম ভাষ্য অনুযায়ী, ‘দ্বিতীয় একাদশের যে টুর্নামেন্টটা হবে সেখানে সুযোগ-সুবিধা কী অনেক বেশি থাকবে? অবশ্যই, না। মিনিমাম স্ট্যান্ডার্ডে যা দেওয়া দরকার, মিনিমাম ম্যাচ ফি থাকবে। ওই ছেলেগুলোর মধ্যে ওই ক্ষুধাটা আনতে হবে ওই যে ৬৫ হাজার টাকা বেতন করেছি বা ১ লাখ টাকা ম্যাচ ফি করেছি ওইটাকে চ্যালেঞ্জ করা। কিভাবে দ্বিতীয় একাদশ থেকে পারফর্ম করে প্রথম একাদশে ঢুকতে পারবে ওই প্রতিযোগিতা তৈরি করার দায়িত্ব হলো আমাদের। আমার দায়িত্ব না কিভাবে ব্যাটিং, বোলিং করতে হয় এসব দেখানো।’

আরো পড়ুন: